সব

ইতিহাসের প্রথম ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়

তৃতীয় শতাব্দির ”জামিয়াতুল কারউইন’’ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়

মৌলানা সহিদুল ইসিলাম ফারুকি | শনিবার, ২৪ নভেম্বর ২০১৮ | 617 বার পড়া হয়েছে
তৃতীয় শতাব্দির ”জামিয়াতুল কারউইন’’ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়

আল কারউইন বিশ্ববিদ্যালয়

মরক্কোর একটি শহরের নাম হলো ‘ফাস’। সেখানে ‘জামিয়াতুল কারউইন বা কারউইন ইউনিভার্সিটি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। আমরা যদি ইসলামি ইতিহাসের প্রসিদ্ধ জামিআ ও ইসলামিক ইউনিভার্সিটিসমূহের অনুসন্ধান করি তাহলে আমরা প্রসিদ্ধ চারটি জামিআ বা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির সন্ধান পাই।

সর্বপ্রথমটি হলো এ জামিআতুল কারউইন। দ্বিতীয়টি হলো তিউনিসিয়ার জামিআ যাইতুনাহ। তৃতীয়টি হলো মিসরের জামিআতুল আযহার। চতুর্থটি হলো ভারতের জামিআ দারুল উলূম দেওবন্দ। ঐতিহাসিক ক্রমধারাও অনুরূপ।



সর্বপ্রথম ইউনিভার্সিটি হলো জামআতুল কারউইন। এটা তৃতীয় শতাব্দীর ইউনিভার্সিটি হওয়ার ব্যাপারে ইতিহাসের গ্রন্থে দাবী করা হয়েছে। এখনো পর্যন্ত সেই দাবীর প্রত্যাখান আমার নজরে পড়েনি। এটা শুধু ইসলমি জগতের প্রথম ইউনিভার্সিটি নয় বরং সমগ্র দুনিয়ার প্রাচীনতম ইউনিভার্সিটি। ঐ সময় জামিআতুল কারউইন ইউনিভার্সিটিতে সেসব বিষয় পাঠদান করা হতো সেগুলো হলো, আরবি ভাষা, তাফসির, হাদিস, ফিকহ এবং তার সাথে সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞান, শারীরিক বিজ্ঞান, ইতিহাস, জোতির্বিদ্যা ইত্যাদি। যেসব বিষয়কে আজ আধুনিক বিষয় বলা হয়। সেইসব বিষয় সেখানে পাঠদান করা হতো।

আল্লামা ইবনে খালদুন, আল্লামা ইবনে রুশদ, কাজী ইয়াজসহ পূর্বসূরীদের এক দীর্ঘ তালিকা আছে যারা সেখানে পাঠদান করেছেন। আল্লামা ইবনুল আরাবী মালিকীও সেখানে পাঠদান করেছেন। আজ পর্যন্ত তাদের আসনসমূহ সেখানে সংরক্ষিত আছে। এটা পৃথিবীর প্রাচীনতম ইউনিভার্সিটি। ছোট ছোট মাদরাসাতো সর্বত্রই ছিলো কিন্তু কারউইন ইউনিভার্সিটি ছিলো একটি মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। এখানে আধুনিক জ্ঞান, ধর্মীয় জ্ঞান, ও জাগতিক সকল জ্ঞান বিজ্ঞান পড়ানো হতো। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো সে যুগের অর্থাৎ হিজরি তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের অনেক নমুনা সংরক্ষিত আছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের আবিষ্কৃত ঘড়ি ও অন্যান্য আবিষ্কার এখনো সেখানে গেলে দেখতে পাবেন।

এটা তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর ইউনিভার্সিটি। ইসলামী জ্ঞানের বিদগ্ধ পণ্ডিতগণ সেখান থেকেই তৈরী হয়েছেন। দার্শনিক ইবনে রুশদ সেখান থেকেই তৈরী হয়েছেন। সেখান থেকে বড় বড় বিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছে। তাহলে সমস্যাটা কী? যতটুকু ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা করা ফরজে আইন তা তো একত্রে সবাইকে শিখানো হতো। এরপর যদি কেউ ধর্মীয় জ্ঞানে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করতে চাইত তাহলে সে ইলমে দীনের ক্লাসও ঐ জামিআতুল কারউইনেই করতো। কেউ যদি অংকশাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করতে চাইত তাহলে সে শাস্ত্রও সে সেখানে পড়ত। চিকিৎসাবিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করতে আগ্রহীরাও সেখানেই পড়ত। এ সকল নেজাম এভাবেই চলত। জামিআ যাইতুনাহ, জামিআতুল আযহারও এভাবে চলত এবং এখনো এভাবেই চলে। এ ইউনিভার্সিটি তিনটি আমাদের প্রাচীনকালের ইউনিভার্সিটি। সেগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষা ও জাগতিক শিক্ষা একই সাথে একই ছাদের নিচে দেওয়া হতো।

এ ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে একটু খেয়াল করুন- আল্লামা কাজী ইয়াজ যিনি হাদিস ও সুন্নতের ইমাম ছিলেন তার অবয়ব ও আকৃতির দিকে তাকান, আল্লামা ইবনে খালদুন যিনি ফিলোসফি ও ইতিহাসের ইমাম ছিলেন তার অবয়ব ও আকৃতির দিকে তাকান, উভয়ের বাহ্যিক আকার অবয়বে কোনো পার্থক্য পাবেন না। ইনি দীনের আলেম আর উনি দুনিয়ার আলেম এমন কোনো বাহ্যিক বিভাজন ছিল না। তাদের অবয়ব আকৃতি, তাহজীব তামাদ্দুন, তাদের জীবন-পদ্ধতি, তাদের কথা বলার ঢং ও মুখের ভাষা সব এক রকম ছিলো।

আমাদের যেসব প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী গত হয়েছেন, যেমন: ফারাবী, ইবনে রুশদ, আবু রায়হান আল বিরুনি তাদের সকলের অবয়ব আকৃতির দিকে তাকান, অতঃপর মুহাদ্দিসীন ও ফুকাহায়ে কিরামের দিকে তাকান, উভয় দলের আকার আকৃতি একই রকম ছিলো। যদি তারা নামায পড়েন তাহলে এরাও নামায পড়েন। যদি তাদের নামাযের মাসায়েল জানা থাকে তাহলে এদেরও আবশ্যকীয় সীমা পর্যন্ত জানা আছে। যদি তাদের রোজার মাসায়েল জানা থাকে তবে এদেরও জানা আছে। ধর্মের মৌলিক শিক্ষা যা শিক্ষা করা প্রত্যেকের জন্য ফরজে আইন তা প্রত্যেক ব্যক্তিই জানতো। আর ওইসব ইউনিভর্সিটিতে দীন-দুনিয়ার সববিষয় পড়ানো হতো।

পার্থক্য শুধু তখন থেকে সৃষ্টি হয়েছে যখন থেকে ইংরেজরা ধর্মহীন সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে এদেশ থেকে দীন ধর্মের কবর রচনার প্রয়াস চালিয়েছিল। তখন আমাদের আকাবির মাশায়িখরা পরিস্থিতির শিকার হয়ে মুসলমানদের দীনি ইলমের সুরক্ষার জন্য কমপক্ষে যতটুকু ফরজে কেফায়া ততটুকু সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করেছিলেন। তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ রকম আলেমে দীন তৈরী করার ব্যবস্থা করেছিলেন যারা ধর্মীয় জ্ঞানে পাণ্ডিত্য অর্জন করে সাধারণ মুসলমানদের ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণ করতে এবং তাদের ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হবে। যে কাজ সরকারি উদ্যোগে ব্যাপকভাবে করার কথা ছিল সেই কাজ তারা নিজেরা করে মুসলমানদের দীনের সংরক্ষণ করেছিলেন। এজন্যই তারা দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ প্রতিষ্ঠান আলহামদুলিল্লাহ সেই বিশাল খেদমত আঞ্জাম দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে, যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

আমাদের দেশ যদি সঠিক অর্থে ইসলামি রাষ্ট্র হতো এবং সঠিক অর্থে তাতে ইসলামি বিধিবিধান প্রয়োগ হতো, তাহলে সেক্ষেত্রে না আমাদের আলীগড়ের শিক্ষা-কারিকুলামের প্রয়োজন ছিলো, না নদওয়াতুল উলামা, না দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষা কারিকুলামের প্রয়োজন ছিলো। আমাদের প্রয়োজন ছিলো জামিআতুল কারউইন বা কারউইন ইউনিভার্সিটির। প্রয়োজন ছিলো জামিআ যাইতুনার।

সূত্র: জামিয়া দারুল উলূম করাচির শাখা ‘হেরা ফাউন্ডেশন স্কুল’ এর হিফজসমাপনী ছাত্রদের সমাবর্তনে আল্লামা মুফতি তাকী উসমানী হাফিযাহুল্লাহুর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ।

Facebook Comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বহুমাত্রিক জীবন

১০ জুলাই ২০১৮ | 826 বার পড়া হয়েছে

শাওয়াল মাসের ফজিলত

১৩ জুন ২০১৯ | 684 বার পড়া হয়েছে

কাতারে একদিনের ‘জোড় ইজতেমা’ শুরু

২৯ নভেম্বর ২০১৮ | 627 বার পড়া হয়েছে

শবে মিরাজ আগামীকাল দিনগত রাতে

০২ এপ্রিল ২০১৯ | 593 বার পড়া হয়েছে

একজন মা-ই সন্তানের প্রকৃত স্বপ্নদ্রষ্টা

০৪ এপ্রিল ২০১৯ | 529 বার পড়া হয়েছে

আলেম নেই যেই তাবলীগে সেই তাবলীগ অন্ধকার তাবলীগ

০৫ ডিসেম্বর ২০১৮ | 462 বার পড়া হয়েছে

পবিত্র রমজান ৬মে

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | 462 বার পড়া হয়েছে

কাতারে একদিনের জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠিত

০৪ ডিসেম্বর ২০১৮ | 461 বার পড়া হয়েছে

উপদেষ্টা সম্পাদক

হাফেজ মাওলানা সাহাদাত হোসাইন

মোহাম্মদ নুরে আলম

হাফেজ মাওলানা আব্দুল হাসিব চৌধুরী

লোকমান আহমেদ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক

চৌধুরী হাসান মাহমুদ

প্রধান সম্পাদক

গোলাম রব্বানী

নির্বাহী সম্পাদক

হাফিজুর রহমান নাহিদ

বার্তা সম্পাদক

তাজ উদ্দিন আহমাদ

বিভাগীয় সম্পাদক

শাহ মাসুম খাদেম

সিএম হাসান

সম্পাদনা সহযোগী

ফয়েজুল ইসলাম চৌধুরী

আশিকুর রহমান

এনামুল হাসান চৌধুরী

যোগাযোগ: উম আল ধম রোড, মাইজার, আল রাইয়্যান, কাতার। ফোন: +974.77664095, ই-মেইল: foursidenews@gmail.com

all right reserved

design and development by: webnewsdesign.com